বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য: ইলোরা গুহা, ভারত

ইলোরা গুহা

 অবস্থান | Location

ইলোরা গুহা [Ellora Caves] হল একটি বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের অন্তর্গত আওরঙ্গবাদ জেলার খুলতাবাদ তালুকে ভেরুল নামক গ্রামে অবস্থিত। মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গবাদ শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এবং অজন্তা গুহা থেকে প্রায়  ১১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ভেলগঙ্গা (velganga) নদীর দক্ষিণ তীরে এ বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ দেখা যায়। 

 জিও কো-অর্ডিনেট | GeoCoordinate

ভারতের ইলোরা গুহা নামক বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-এর জিও কো-অর্ডিনেট (অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ) হল 20°01’32.9″N 75°10’40.8″E (20.025816, 75.177994)

স্থাপত‌্যিক বিবরণ | Architectural Description

ভারতের ইলোরা গুহা হল মূলত মহারাষ্ট্রে অবস্থিত চরনন্দ্রী পাহাড়ের প্রায় ২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পাথর (শিলা) কেটে তৈরি ৩৪টি বিহার এবং মন্দির নিয়ে প্রতিষ্ঠিত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। ইলোরার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে পাথর কেটে নির্মিত ১২টি বৌদ্ধ গুহা মন্দির, ১৭টি হিন্দু গুহা মন্দির এবং ৫টি জৈন গুহা মন্দির।

ইলোরার বৌদ্ধ গুহাসমূহ প্রাথমিক স্থাপনারগুলোর মধ্যে অন্যতম। বৌদ্ধ গুহার এ স্থাপনাসমূহের বেশিরভাগ বিহার এবং মঠের সমন্বয়ে গঠিত। এর মধ্যে বাসস্থান, শোবার ঘর, রান্নাঘর এবং অন্যান্য কক্ষসহ পাহাড়ের গায়ে খোদাইকৃত বহুতল ভবনও রয়েছে। এসব গুহার কিছু কিছুর গায়ে খোদাইকৃত গৌতম বুদ্ধ, বোধিসত্ত্ব এবং পন্ডিতদের প্রতিমা রয়েছে।

ইলোরার হিন্দু গুহা মন্দিরসমূহ স্থাপত্যশিল্পের সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং সুচারু দক্ষতার পরিচয় বহন করে। এসব মন্দিরের কিছু কিছু স্থাপনা এতটাই জটিল প্রকৃতির যে, এগুলোর নির্মাণকাজ শেষ করতে কয়েকটি বংশ পরম্পরা পরিকল্পনা এবং পরিচালনা করতে হয়েছে। এখানকার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং সেরা কীর্তি হল একটি একক শিলায় খোদিত কৈলাশনাথ মন্দির। এ মন্দিরের দেয়াল জুড়ে রাবণ, শিব ও পার্বতীসহ হিন্দু পুরাণের নানা চরিত্রের মূর্তি খোদিত রয়েছে । মন্দিরটির অভ্যন্তরে ছাদের দেয়ালে বিভিন্ন চিত্র শোভিত রয়েছে।

ইলোরার জৈনগুহাগুলো মূলতঃ জৈন দর্শন এবং ঐতিহ্যের ধারক। এসব জৈন গুহা ইলোরার অন্যান্য গুহার তুলনায় আকারে ছোট। এ গুহাগুলো বিভিন্ন শিল্পকলার পরিচয় বহন করে চলেছে। এখানকার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য জৈনমন্দিরগুলো হল ছো্ট কৈলাশ, ইন্দ্রসভা এবং জগন্নাথসভা।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট | Historical Background

ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শতাব্দীতে (CE) ভারতে রাজত্বকারী একটি রাজবংশ রাষ্ট্রকূটের আমলে (Rashtrakuta dynasty) ভারতের ইলোরা গুহার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ নির্মাণ এবং উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিল। ইলোরা গুহা মন্দিরগুলো মূলতঃ কালাচুরি, চালুক্য ও রাষ্ট্রকুট শাসনামলে নির্মিত বিখ্যাত হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন মন্দির। ৯ম শতাব্দীতে রাষ্ট্রকুটের শাসনামলে ৫টি জৈন মন্দির নির্মাণ করা হয়।

ইলোরার বৌদ্ধ গুহা মন্দিরগুলো সম্ভবত ৬ষ্ঠ শতাব্দীর প্রথমার্ধ্বে নির্মাণ করা হয়েছিল। হিন্দু গুহা মন্দিরগুলো তুলনামূলক পরবর্তীকালে নির্মাণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রকূট শাসকগণ বৌদ্ধ গুহা মন্দিরগুলো সংস্কার করেন। জৈনধর্মের পৃষ্ঠপোষক প্রথম অমোঘবর্ষ তাঁর রাজত্বকালে ইলোরায় ৫টি জৈন গুহা মন্দির নির্মাণ করেছিল। ইলোরায় রাষ্ট্রকূটদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং সেরা কীর্তি হল রাজা প্রথম কৃষ্ণ-এর আমলে নির্মিত একটি একক শিলায় খোদিত কৈলাশনাথ মন্দির। কৈলাশনাথ মন্দিরটিই হল রাষ্ট্রকূট শাসকদের ‘বলহার’ বা ‘বিশ্বের চার প্রধান সম্রাটের অন্যতম’ সম্মানের পরিচায়ক।

অসামান্য সার্বজনীন মান | Outstanding Universal Value

বিশ্ব ঐতিহ্য নির্বাচনের মানদণ্ড (the criteria for selection) ১ম (i), ৩য় (iii), ও ৫ম (vi) এর ভিত্তিতে অসামান্য সার্বজনীন মান (outstanding universal value) পূরণ করায় ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক ভারতের ইলোরা গুহা (Ellora Caves) নামক এ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটিকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকাভূক্ত করা হয়।

মানদণ্ড (criterion) ১ম (i) : ইলোরার শিলা কাটা স্থাপত্য (rock cut architecture) সমাহার একটি অনন্য শৈল্পিক কৃতিত্ব, যা মানুষের সৃজনশীল প্রতিভার একটি সেরা শিল্পকর্ম (masterpiece)। পাথর (শিলা) খনন ও খোদাই করে কৈলাশ মন্দিরের মত একটি স্মৃতি নিদর্শন নির্মাণ একটি অসাধারণ প্রযুক্তিগত কাজ হিসেবে বিবেচিত। যাহোক, ‘নির্মিত’ স্থাপত্য থেকে স্থানান্তরিত মডেলের মন্দির একটি অত্যন্ত উচ্চ মানের শিল্পের ভাস্কর্য এবং চিত্রিত রূপগুলোর একটি অসাধারণ কোষ এবং একটি বিশ্বকোষীয় ঘটনা প্রদর্শন করে।

মানদণ্ড (criterion) ৩য় (iii) : ইলোরা ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শতাব্দীতে (CE) নির্মিত নিদর্শনগুলোর নিরবচ্ছিন্ন ক্রমসহ প্রাচীন ভারতের সভ্যতাকে আবার জীবিত করে।

মানদণ্ড (criterion) ৫ম (vi) : ইলোরা গুহা কেবল বৌদ্ধধর্ম, ব্রাহ্মণ্যবাদ (হিন্দু ধর্ম) এবং জৈন ধর্মের মত তিনটি মহান ধর্মের সাক্ষ্যই বহন করে না, তাদের সহনশীলতার চেতনা, এবং প্রাচীন ভারতের বৈশিষ্ট্যকে চিত্রিত করে, যা এ তিনটি ধর্মকে তাদের উপাশনার স্থান এবং তাদের সম্প্রদায়কে এক জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করার অনুমতি দিয়েছে, যা এরূপে ইলোরা গুহার সার্বজনীন মানকে (universal value) শক্তিশালী করেছে।

লেখক: মো. শাহীন আলম  

Reference:
1. Ellora Caves
2. Rashtrakuta Dynasty


image source: Ellora Caves


Add a Comment

Your email address will not be published.