বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য: কাঠমান্ডু উপত্যকা, নেপাল

কাঠমান্ডু উপত্যকা

 অবস্থান | Location

কাঠমান্ডু উপত্যকা [Kathmandu Valley] নামক বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নেপালের হিমালয় পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত। এ বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্তর্গত ৭টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু শহরের প্রাণকেন্দ্রে এবং এ শহরের সন্নিকটবর্তী ৭টি স্থানে দেখা যায়। 

 জিও কো-অর্ডিনেট | GeoCoordinate

নেপালের কাঠমান্ডু উপত্যকা নামক বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-এর অন্তর্গত ৭টি পুরাকীর্তির বা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের জিও কো-অর্ডিনেট (অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ) হল (১) হনুমান ধোকা দরবার স্কয়ার (Hanuman Dhoka Durbar Square) 27.70427, 85.30741 (27.704270, 85.307410), (২) পাঠান দরবার স্কয়ার (Patan Durbar Square) 27°40’21.7″N 85°19’31.2″E (27.672690, 85.325320), (৩) ভক্তপুর দরবার স্কয়ার (Bhaktapur Durbar Square) 27°40’19.5″N 85°25’41.2″E (27.672070, 85.428100), (৪) স্বয়ম্ভু (Swayambhu) 27°42’53.8″N 85°17’25.2″E (27.714930, 85.290330), (৫) বৌধনাথ (Bauddhanath) 27°43’17.4″N 85°21’43.2″E (27.721500, 85.361990), (৬) পশুপতি (Pashupati) 27°42’37.9″N 85°20’55.8″E (27.710520, 85.348840), এবং (৭) চাঙ্গু নারায়ণ (Changu Narayan) 27°42’58.0″N 85°25’48.0″E (27.716100, 85.429990)

স্থাপত‌্যিক বিবরণ | Architectural Description

নেপালের কাঠমন্ডু উপত্যকা এমন একটি স্থান, যেখানে এশিয়ার প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনগুলো অবস্থিত ৷ এখানে প্রায় ১৩০টি ভাস্কর্যসহ হিন্দু ও বৌদ্ধের বহু ধর্মীয় নিদর্শন রয়েছে ৷ কাঠমান্ডু উপত্যকা নামক বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ৭টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নিয়ে গঠিত, যা ঐতিহাসিক এবং শৈল্পিক কৃতিত্বের পরিপূর্ণতাকে প্রদর্শন করছে। আর এ কারণে কাঠমান্ডু উপত্যকা বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত। কাঠমান্ডু উপত্যকার অন্তর্গত পুরাকীর্তি বা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানসমূহ হল (১) হনুমান ধোকা দরবার স্কয়ার, (২) পাঠান দরবার স্কয়ার, (৩) ভক্তপুর দরবার স্কয়ার, (৪) স্বয়ম্ভু , (৫) বৌধনাথ, (৬) পশুপতি, এবং (৭) চাঙ্গু নারায়ণ।

হনুমান ধোকা দরবার স্কয়ার হল ভাস্কর্য, মন্দির, শিলালিপি ও রাজকীয় প্রাসাদসহ রাজবংশের দরবার স্কয়ার, যা নেপালের কাঠমান্ডুর একটি জটিল কাঠামো। পাঠান দরবার স্কয়ারের অন্যতম আকর্ষণ হল মার্বেল পাথর ও ইটের তৈরি অলংকৃত মন্দির এবং প্রাচীন রাজপ্রাসাদ। ভক্তপুর দরবার স্কয়ার হল মন্দির, ভাস্কর্য এবং রাজকীয় প্রাসাদ নিয়ে একটি স্কয়ার কমপ্লেক্স, যেখানে রয়েছে দরবার স্কয়ার, তৌমাধি স্কয়ার, দত্তাত্রেয় স্কয়ার এবং মৃৎপাত্র স্কয়ার নামক ৪টি স্কয়ার।

স্বয়ম্ভুর স্থাপত্যিক ঐতিহ্য হল একটি স্তূপ (stupa) নিয়ে প্রাচীনতম বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ। বৌধনাথের মধ্যে রয়েছে নেপালের বৃহত্তম স্তূপ (stupa)। পশুপতিতে রয়েছে একটি বিস্তৃত হিন্দু মন্দির প্রাঙ্গণ। চাঙ্গু নারায়ণে রয়েছে প্রাচীনতম শিলালিপিসহ ঐতিহ্যবাহী নেওয়ারি (Newari) বসতি এবং একটি হিন্দু মন্দির কমপ্লেক্সে, যা খ্রিস্টীয় ৫ম শতাব্দী থেকে উপত্যকায় গড়ে উঠেছে।

এ বিশ্ব ঐতিহ্যে বিদ্যমান বহু তলাবিশিষ্ট মন্দিরগুলোর (tiered temples) বেশিরভাগই কাদা মর্টার (mud mortar) এবং কাঠের কাঠামোসহ ইট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। মন্দিরের ছাদগুলো সোনালি বর্ণের পিতলের অলঙ্করণসহ ছোট ছোট পোড়ামাটির টালি (tiles) দিয়ে আবৃত। মন্দিরের জানালা, দরজা এবং ছাদের স্ট্রটে উন্নতমানের অলংকরণ রয়েছে। এ বিশ্ব ঐতিহ্যের বৃহৎ আকারের স্তূপগুলো সাধারণ মানের, তবে এদের শক্তিশালী রূপ রয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট | Historical Background

বৌদ্ধ এবং হিন্দুধর্ম শত শত বছর ধরে এশিয়া জুড়ে বিকশিত এবং পরিবর্তিত হয়ে নেপালে সমৃদ্ধ হয়েছে। উভয় ধর্ম নেপালে একটি শক্তিশালী শৈল্পিক ও স্থাপত্যিক সংমিশ্রণ তৈরি করেছে, যা আনুমানিক খ্রিস্টীয় ৫ম শতাব্দী থেকে শুরু হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে খ্রিস্টীয় ১৫০০ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এ শৈল্পিক ও স্থাপত্যিক সংস্কৃতি পরিপূর্ণতা পায়। এসব শৈল্পিক ও স্থাপত্যিক নিদর্শন হল নেওয়ারিদের (Newari) অসামান্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। যা তাদের অনন্য শহুরে বসতি, ভবন এবং কাঠামোতে উন্নত অলঙ্করণসহ ইট, পাথর, কাঠ এবং ব্রোঞ্জের অসামান্য কারুকার্য প্রদর্শন করেছে। যা বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।

অসামান্য সার্বজনীন মান | Outstanding Universal Value

বিশ্ব ঐতিহ্য নির্বাচনের মানদণ্ড (the criteria for selection) ৩য় (iii), ৪র্থ (iv) ও ৬ষ্ঠ (vi)  এর ভিত্তিতে অসামান্য সার্বজনীন মান (outstanding universal value) পূরণ করায় নেপালের ৭টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নিয়ে ১৯৭৯ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক কাঠমান্ডু উপত্যকা [Kathmandu Valley] নামে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকাভূক্ত করা হয়।

মানদণ্ড (criterion) ৩য় (iii) : ৭টি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কাঠমান্ডু উপত্যকার ঐতিহ্যবাহী সভ্যতার একটি ব্যতিক্রমী সাক্ষ্য বহন করে। এ নিদর্শনগুলো হল বিগত ২ হাজার বছর যাবত দুর্গম হিমালয় উপত্যকায় বসতি স্থাপনকারী নেওয়ারিসহ বহু জাতিগত লোকের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা বিশ্বে অনন্য শহুরে সমাজ উদ্ভাবন মাধ্যমে ইট, পাথর, কাঠ এবং ব্রোঞ্জ দিয়ে সবচেয়ে উন্নত কারুকার্যের প্রদর্শন করেছে। সর্বপ্রাণবাদ ও তন্ত্রবাদসহ হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের সহাবস্থান এবং সংমিশ্রণকে অনন্য (unique) বিবেচনা করা হয়েছে।

মানদণ্ড (criterion) ৪র্থ (iv) : এ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ব্যতিক্রমী স্থাপত্যের প্রকারভেদ, সমাহার এবং শহুরে কাঠামো, যা খ্রিস্টীয় ১৫০০ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে কাঠমান্ডু উপত্যকার সংস্কৃতিকে অত্যন্ত উন্নত স্থানে নিয়ে যায়। প্রাসাদ কমপ্লেক্স, মন্দির এবং স্তূপের সমাহার হল কাঠমান্ডু উপত্যকার চমৎকার উদাহরণ।

মানদণ্ড (criterion) ৬ষ্ঠ (vi) : এ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সর্বপ্রাণবাদ ও তন্ত্রবাদসহ হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের অনন্য সহাবস্থান এবং সংমিশ্রণে স্পষ্টভাবে সম্মিলিত রয়েছে। প্রাচীন স্থাপনাগুলোর অলঙ্করণে, শহুরে কাঠামোতে এবং আশেপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রতীকী এবং শৈল্পিক মূল্যবোধ প্রদর্শন করে, যা কিংবদন্তি, আচার এবং উৎসবের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

লেখক: মো. শাহীন আলম  

Reference:
1. Kathmandu Valley


image source: World Heritage Centre


Add a Comment

Your email address will not be published.