জৈন্তাপুরের মেগালিথিক সমাধি | সিলেট

জৈন্তেশ্বরী রাজবাড়ি ও মেগালিথিক টম্ব

 অবস্থান | Location

বাংলাদেশের সিলেট জেলাধীন জৈন্তাপুর উপজেলায় তিনটি স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে প্রাচীন মেগালিথিক সমাধিগুলি অবস্থিত। এ সমাধিগুলি হল মূলতঃ ছোট বড় একাধিক পাথরের ফলক দিয়ে নির্মিত ঐতিহ্যবাহী কতিপয় স্মৃতিস্তম্ভ। এ স্মৃতিস্তম্ভগুলির অবস্থান জৈন্তাপুর উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে (ক) জৈন্তেশ্বরী রাজবাড়ির সামনে, (খ) খাসিয়া পল্লী অঞ্চলে নিজপাটে (মন্ত্রীর বাড়ির সামনে), এবং (গ) মুক্তারপুর অঞ্চলের সিলেট-তামাবিল সড়কস্থ জাঙ্গিল বাজারে। এ মেগালিথিক সমাধিগুলিকে অনেকে আবার মেগালিথিক টম্ব (Megalithic Tomb) বলে থাকেন।

 জিও কো-অর্ডিনেট | GeoCoordinate

সিলেট জেলার জৈন্তাপুর উপজেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে জৈন্তেশ্বরী রাজবাড়ি এবং তৎসংলগ্ন মেগালিথিক সমাধিগুলির জিও কো-অর্ডিনেট (অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ) হল (ক) 25°08’05.9″N 92°07’21.3″E (25.134972, 92.122583), (খ) 25°08’05.0″N 92°07’35.9″E (25.134730, 92.126650) এবং (গ) 25°08’22.5″N 92°07’11.9″E (25.139570, 92.119970)

স্থাপত‌্যিক বিবরণ | Architectural Description

বর্তমানে জৈন্তাপুর উপজেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রাচীন দেয়ালবিষ্টিত ভগ্ন প্রবেশ ফটক, মন্দির ও অন্যান্য স্থাপত্যিক কাঠামোর ধ্বংসাবশেষসহ জৈন্তেশ্বরী রাজবাড়িটি রয়েছে। বাড়ির সামনের দেয়াল জুড়ে মানুষসহ বিভিন্ন পশুর চিত্র রয়েছে। রাজবাড়িটির দক্ষিণ পাশের দেয়াল ও প্রবেশ ফটকের সামনে মেগালেথিক সমাধি বা মেগালেথিক টম্ব খ্যাত ছোট ও বড় কতিপয় পাথর বা প্রশস্তরখণ্ড রয়েছে। এ পাথর বা প্রশস্তরখণ্ডগুলোর মধ্যে ৪টি দণ্ডায়মান প্রোথিত পাথর (মেনহির) ও পাথরের পায়ার উপর প্রতিষ্ঠিত ৬টি পাথরের বেদী (ডলমেন) রয়েছে। মেনহিরগুলির গড় উচ্চতা ২.৪ মিটার। সর্ববৃহৎ ডলমেনটির দৈর্ঘ্য ৩.৫ মিটার এবং প্রস্থ ২.৬২ মিটার।

এছাড়া জৈয়েন্তশ্বরী রাজবাড়িটির সামনের সড়কের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে ৭টি দণ্ডায়মান প্রোথিত পাথর (মেনহির) ও পাথরের পায়ার উপর প্রতিষ্ঠিত প্রায় ১২টি পাথরের বেদী (ডলমেন), এবং দক্ষিণ পাশে ১টি দণ্ডায়মান প্রোথিত পাথর (মেনহির) ও পাথরের পায়ার উপর প্রতিষ্ঠিত ৩টি পাথরের বেদী (ডলমেন) রয়েছে। এ বেদীগুলো বিভিন্ন আকৃতির, যেমন – বর্গাকার, আয়তাকার এবং প্রায় গোলাকার। এখানে ৮টি মেনহিরের গড় উচ্চতা ২.৬৭ মিটার। তবে সড়কের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে প্রায় ১২টি ডলমেনের কথা উল্লেখ করা হলেও এখানে এদের সংখ্যা নির্ধারণ করা একটু কঠিন। কারণ বর্তমানে এগুলি অসংখ্য খণ্ডে টুকরো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

জৈয়েন্তশ্বরী রাজবাড়ি থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে খাসিয়া পল্লী অঞ্চলের নিজপাটে (মন্ত্রী বাড়ীর সামনে) ২টি দণ্ডায়মান প্রোথিত পাথর (মেনহির) ও পাথরের পায়ার উপর প্রতিষ্ঠিত ২টি পাথরের বেদী (ডলমেন) রয়েছে। এর মধ্যে প্রোথিত পাথরের (মেনহির) গায়ে ফুলের অলংকরণ দেখা যায়। এ বেদী (ডলমেন) ২টি প্রায় আয়তাকার। এদের সামনে ইট দিয়ে নির্মিত ১টি তোরণ রয়েছে।

মুক্তারপুর অঞ্চলের সিলেট-তামাবিল সড়কস্থ জাঙ্গিল বাজারে ২টি দণ্ডায়মান প্রোথিত পাথর (মেনহির) ও পাথরের পায়ার উপর প্রতিষ্ঠিত প্রায় ৩টি পাথরের বেদী (ডলমেন) রয়েছে। এ বেদীগুলো বিভিন্ন আকৃতির; কোনটি বর্গাকার, আবার কোনটি প্রায় আয়তাকার। সর্ববৃহৎ মেনহিরটি ১.৬০ মিটার উঁচু। ৪ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৩.৮ মিটার প্রস্থবিশিষ্ট ১টি ডলমেন খুবই ক্ষতিগ্রস্ত।

মেগালিথিক টম্ব, সিলেট

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট | Historical Background

বিভিন্ন তথ্যসূত্র অনুযায়ী, জৈন্তেশ্বরী বাড়িটি হল প্রকৃতপক্ষে সিন্টেং বা জৈন্তিয়া রাজাদের ঐতিহাসিক বাড়ি। ১৬১৮ সালে জৈন্তিয়ার রাজা যশোমানিক কোচরাজ লক্ষ্মীনারায়ণের কন্যাকে বিয়ে করেন। বিয়ের উপহার হিসেবে রাজা যশোমানিক মূল্যবান ১টি কালী মূর্তি প্রাপ্ত হন। ধাতু দিয়ে নির্মিত এ মূর্তিটিকে এ বাড়িতে জৈন্তেশ্বরী কালী নামে প্রতিষ্ঠা করেন। একই সাথে এ বাড়িটিকে রাজ্যের শাসন কাজেও ব্যবহার করা হত।

লোকগাঁথা ও তাম্রশাসনের বিভিন্ন তথ্য থেকে আরও জানা যায়, আনুমানিক ৭ম কিংবা ৮ম শতাব্দীতে জৈন্তাপুর রাজ্য কামরূপ রাজ্যের শাসনাধীনে ছিল।পরবর্তীতে এ রাজ্যটি যথাক্রমে চন্দ্র এবং বর্মণ শাসকদের শাসনাধীন হয়। বর্মণ শাসকদের পতনের পর জৈন্তাপুর পুনরায় কিছু সময়ের জন্য দেব বংশের শাসন অধীন চলে আসে। দেব বংশের শেষ শাসক জয়ন্ত রায়ের জয়ন্তী নামক ১টি কন্যা ছিল। এ কন্যার সাথে খাসি আদিবাসী প্রধানের এক পুত্র লান্দোয়ারের বিয়ে হয়। এ বিয়ের সূত্র ধরে আনুমানিক ১৫০০ সালে জৈন্তাপুর রাজ্য খাসিয়াদের শাসনাধীনে চলে যায়। ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থা চালুর আগে জৈন্তাপুর রাজ্য স্বাধীনভাবে খাসিয়া রাজাদের শাসনাধীন ছিল। বর্তমান জৈন্তাপুর উপজেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে জৈন্তেশ্বরী রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, এ ধ্বংসাবশেষের সামনে এবং তৎসংলগ্ন নিকটবর্তী দূরত্বে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ছোট ও বড় কতিপয় পাথরখণ্ড দিয়ে নির্মিত মেগালিথিক সমাধি রয়েছে। জৈন্তাপুরের এসব মেগালিথিক সমাধি নিয়ে কয়েকটি কিংবদন্তী প্রচলিত রয়েছে।

প্রথমতঃ পাথরের বেদীর (ডলমেন) উপরে বসে রাজা শাসন কাজ পরিচালনা করতেন। স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, সবচেয়ে বড়পাথরের বেদী (ডলমেন)টিতে রাজা বসতেন। তুলনামূলক ছোট পাথরের বেদীগুলো ছিল রাজ্যে আঞ্চলিক দলপতিতের জন্য। আরও জানা যায় যে, ভিন্ন ভিন্ন রাজার জন্য ভিন্ন ভিন্ন পাথরের বেদী (ডলমেন) নির্মিত হয়ে ছিল। রাজা ও দলপতিগণ এসব বেদীর উপরে বসে বিচার কাজও করতেন।  আবার কারো কারো মতে, বড়পাথরের বেদীর (ডলমেনে) উপরে বসে রাজ্যে কর্মচারীরা খাজনা আদায় করতেন।

দ্বিতীয়তঃ মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তির জন্য দণ্ডায়মান প্রোথিত পাথর (মেনহির) ও পাথরের বেদী (ডলমেন) দিয়ে সমাধি  নির্মাণ করা হত। বিভিন্ন রাজা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর পরে প্রত্যেকের জন্য আলাদা এসব পাথরের সমাধি নির্মাণ করা হয়েছে। আরও জানা যায় যে, বহু প্রাচীনকাল থেকে এ প্রথা প্রচলিত ছিল। তবে মুক্তারপুর অঞ্চলের সিলেট-তামাবিল সড়কস্থ জাঙ্গিল বাজারের সৌধ সম্পর্কে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, এখানে রয়েছে কোন এক রাজ কুমারীর সমাধি।

প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যালোচনায় জানা যায়, মেগালিথিক টম্ব নির্মাণকরণ অনেক প্রাচীন একটি প্রথা। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সমাধি বা স্মারক হিসেবে এসব মেগালিথিক টম্ব নির্মাণ করা হয়েছে। অর্থাৎ কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মৃত্যুর পরে তাঁর কবরকে চিহ্নিত করে রাখার জন্য এ মেগাথিলিক সৌধ নির্মাণ করা হত। এমনকি কোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে মানুষের মাঝে স্মরণীয় করে রাখার জন্য মেগালিথিক সৌধগুলো নির্মাণ করা হত বলে জানা যায়। এ পর্যালোচনা থেকে প্রতীয়মান হয়, সম্ভবত জৈন্তেশ্বরী বা জৈন্তিয়া রাজা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর পরে প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা এসব পাথরের সমাধি নির্মাণ করা হয়েছিল। 

বিশ্বে বিভিন্ন স্থানের বিভিন্ন ধরনের মেগালিথিক টম্ব পরিলক্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও কেরালা, কর্ণাটকসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে, এবং দক্ষিণ কোরিয়া, ইসরাইল, জর্ডান, জার্মানী প্রভৃতি দেশে মেগালিথিক টম্ব রয়েছে। দেশভেদে মেগালিথিকগুলোর বৈশিষ্ট্যগত ও নামের ভিন্নতা রয়েছে। যেমন- মেনহির (Menhir), ডলমেন (Dolmen), স্টোন সারকেল (Stone Circle), মাল্টিপল হুডস্টোন (Multiple Hoodstone) প্রভৃতি। বাংলাদেশের সিলেট জেলায় অবস্থিত মেগালিথিক সমাধি বা টম্বের সাথে কেবল ২টি ধরনের মিল খোঁজে পাওয়া যায়। এগুলো হল – মেনহির (Menhir)ডলমেন (Dolmen)। সিলেট জেলার জৈন্তাপুর উপজেলায় অবস্থিত জৈন্তেশ্বরী বাড়িসহ এ মেগালিথিক সমাধিগুলিকে ২ মে, ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সংরক্ষিত প্রত্নস্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়।  যা বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত এবং তত্ত্বাবধানে রয়েছে। 

উল্লেখ্য যে, গ্রিক শব্দ ‘μέγας‘ থেকে মেগালিথিক (megalithic) বা মেগালিথ (megalith) শব্দের উৎপত্তি। মেগা (mega) মানে হল মহান বা বড় (big/large), এবং লিথ (lith) মানে পাথর বা প্রস্তর (stone)। যার অর্থ দাঁড়ায় ‘মহান বা বড় পাথর‘। মেগালিথিক (megalithic) বা মেগালিথ (megalith) + টম্ব (tomb) এর মানে বুঝায় মহান বা বড় পাথরের নির্মিত সমাধি

লেখক: মো. শাহীন আলম  

তথ্যসূত্র:
১. যাকারিয়া, আবুল কালাম মোহাম্মদ, ২০১১, বাঙলাদেশের প্রত্নসম্পদ, দিব্য প্রকাশ, ঢাকা, পৃষ্ঠা ৫৯৩ – ৫৯৫।
২. জৈন্তাপুর
৩. মেগালিথ
৪. বাংলাদেশের মেগালিথিক সৌধ
৫. Megalithic Cultures of Central India and Deccan during the period circa 1000 B.C.E TO 300 B.C.E
৬. মেগালিথ সমাধি সৌধ
৭. জৈন্তাপুরের মেগালিথিক সমাধি সৌধ
৮. প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর


Add a Comment

Your email address will not be published.