বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্য: সুন্দরবন, বাংলাদেশ

সুন্দরবন, বাংলাদেশ

 অবস্থান | Location

সুন্দরবন [The Sundarbans] হল একটি বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, যা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা বিভাগের অন্তর্গত বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলায় অবস্থিত। মূলতঃ বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী এ তিনটি জেলার দক্ষিণাংশে এ বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রাকৃতিক নিদর্শনসমূহ দেখা যায়। 

 জিও কো-অর্ডিনেট | GeoCoordinate

বাংলাদেশের সুন্দরবন নামক বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের ভৌগোলিক অবস্থান (অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশ) হল ২১°৩৮’২৫.৬” উত্তর থেকে ২২°৩০’০৮.৬” উত্তর এবং ৮৯°০১’৫৬.৫” পূর্ব থেকে  ৮৯°৫৩’২৭.২” পূর্ব

 বিবরণ | Description

সুন্দরবন নামক ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট হল পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বনভূমি (১,৪০,০০০ হেক্টর)। যা বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা নদীর ব-দ্বীপে অবস্থিত। সুন্দরবনের বাংলাদেশের এ অংশটি অবস্থান ১৯৮৭ সালে ইউনেস্কো ঘোষিত ভারতের সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্যের সীমানা সংলগ্ন পূর্ব পাশে। এ ঐতিহ্য স্থানটি জোয়ারের জলপথ, কর্দমময় প্রান্তর এবং লবণ-সহনশীল ম্যানগ্রোভ বনের ছোট দ্বীপগুলির একটি জটিল নেটওয়ার্ক এবং চলমান পরিবেশগত প্রক্রিয়ার একটি চমৎকার উদাহরণ উপস্থাপন করে। এ বনভূমিটি বহু প্রাণীর বিস্তৃতির জন্য সুপরিচিত, যার মধ্যে রয়েছে ২৬০ প্রজাতির পাখি, রয়েল বেঙ্গল টাইগার (বাঘ) এবং অন্যান্য বিপন্ন প্রজাতির জীবজন্তু; যেমন – মোহনার কুমির এবং ভারতীয় অজগর।

বিশ্ব ঐতিহ্য নির্বাচনের অসামান্য সার্বজনীন মান (outstanding universal value) পূরণ করায় বাংলাদেশের প্রাকৃতিকভাবে ঐতিহ্যবাহী স্থানটিকে ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ঘোষণা করা হয়। 

অসামান্য সার্বজনীন মান | Outstanding Universal Value

বিশ্ব ঐতিহ্য নির্বাচনের মানদণ্ড (the criteria for selection) নয় (ix) এবং দশ (x) এর ভিত্তিতে অসামান্য সার্বজনীন মান (outstanding universal value) পূরণ করায় ইউনেস্কো কর্তৃক বাংলাদেশে অবস্থিত জীববৈচিত্রের অসাধারণ (unique) নিদর্শন সুন্দরবন নামক ম্যানগ্রোভ বনভূমিটিকে বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের তালিকাভূক্ত করা হয়। নির্বাচনের মানদণ্ড-এর ভিত্তিতে এ ঐতিহ্য স্থানটি যে  অসামান্য সার্বজনীন মান (outstanding universal value) পূরণ করে, তা নিম্নে তুলে ধরা হল –

মানদণ্ড (Criterion) নয় (ix) : সুন্দরবন হল চলমান পরিবেশগত প্রক্রিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ; কারণ এ বনভূমিটি ব-দ্বীপ গঠনের প্রক্রিয়ার এবং পরবর্তীকালে নবগঠিত ব-দ্বীপ ও সংশ্লিষ্ট ম্যানগ্রোভ সম্প্রদায়ের উপনিবেশ স্থাপনের প্রতিনিধিত্ব করে। এখানকার পরিবেশগত প্রক্রিয়াগুলির মধ্যে রয়েছে মৌসুমী বৃষ্টিপাত, বন্যা, ব-দ্বীপ গঠন, জোয়ারের প্রভাব এবং উদ্ভিদের উপনিবেশ। এটি বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপের অংশ হিসেবে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা নামক তিনটি বৃহৎ নদীবাহিত পলি দিয়ে গঠিত এবং বঙ্গীয় অববাহিকা আচ্ছাদিত; এখানে জোয়ারের ক্রিয়ার ফলে ভূমি গঠিত হয়েছে, এসব পরিবেশগত প্রক্রিয়ার ফলে সুন্দরবনে একটি  স্বতন্ত্র জীববৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়েছে।

মানদণ্ড (Criterion) দশ (x): সুন্দরবন হল বিশ্বের ম্যানগ্রোভ বনভূমির অবশিষ্ট বৃহত্তম এলাকাগুলির মধ্যে একটি। যা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের (বাঘের) মত বিশ্বের বিপন্ন বিড়াল (cat) প্রজাতিসহ স্থল ও সামুদ্রিক উভয় পরিবেশের ব্যতিক্রমী জীববৈচিত্র্যের এক আশ্রয়স্থল। এক শুমারি অনুযায়ী, সুন্দরবনে ৪০০ থেকে ৪৫০টি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার (বাঘ) রয়েছে, যা বিশ্বের অন্যান্য যে কোন বনভূমির বাঘের তুলনায় বেশি ঘনত্বপূর্ণ।

সুন্দরবন হল নিচু বাংলা অববাহিকার (Bengal Basin) মধ্যে বিস্তৃত জীবজগতের একমাত্র বাসস্থান। এ বাসস্থানটি ২৪৫টি বংশ (genera) এবং ৭৫টি পরিবার (families), ১৬৫টি শেওলা প্রজাতি (algae) এবং ১৩টি অর্কিড (orchid) প্রজাতিসহ ৩৩৪টি উদ্ভিদ প্রজাতির বিস্তৃত সমাহার, যা সুন্দরবনের ব্যতিক্রমী জীববৈচিত্রকে প্রকাশ করেছে।

সুন্দরবনে রয়েছে ৬৯৩ প্রজাতির বন্যপ্রাণী; এদের মধ্যে ৪৯টি স্তন্যপায়ী (mammals), ৫৯টি সরীসৃপ (reptile), ৮টি উভচর (amphibians), ২১০টি সাদা মাছ (white fishes), ২৪টি চিংড়ি (shrimps), ১৪টি কাঁকড়া (crabs) এবং ৪৩টি শামুকের প্রজাতি (mollusks) অন্তর্ভূক্ত।

সুন্দরবনে রয়েছে ৯টি মাছরাঙ্গা (kingfisher) এবং চমৎকার সাদা বেলযুক্ত সমুদ্র ঈগলসহ ৩১৫ প্রজাতির জলচর পাখি (waterfowl), রেপটর (raptors) এবং বন্য পাখি (forest birds) নিয়ে বৈচিত্র্যময় এবং রঙ্গিন পাখির জীবন, যা সুন্দরবনের অন্যতম বড় আকর্ষণ।

লেখক: মো. শাহীন আলম  

Reference:
1. The Sundarbans


image source: World Heritage Centre


Add a Comment

Your email address will not be published.